কীলগার কি? কীভাবে বানাতে হয় ও নিরাপদ থাকা যায়?

কীলগার কি? কীভাবে বানাতে হয় ও নিরাপদ থাকা যায়?

কীলগার কি? কীভাবে বানাতে হয়? টেকনিসিয়াম


হ্যাকিংয়ে বা কোন ডিভাইস হ্যাক করার জন্য হ্যাকাররা বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করে। আর এ সুবিশাল উপায়ের মাঝে একটি জনপ্রিয় উপায় হলো কীস্ট্রোক লগিং। এটি জনপ্রিয় কারণ এটি ব্যবহার করে একেতো ব্যবহারকারীর সকল তথ্য চুরি করা যায়, দ্বিতীয়ত যেকোন ছেঁচকা হ্যাকাররাও এটি ব্যবহার করতে পারে। এটিকে সংক্ষিপ্ত আকারে স্মার্টলি কীলগিং বলা হয়ে থাকে।

কীলগিং হলো সিস্টেম মনিটর করার একটি উপায় যেটির সাহায্যে কোন ব্যবহারকারীর কী-বোর্ডের প্রতিটি স্ট্রোক বা এক কথায় যাই টাইপ করবে তাই রেকর্ড করা যায়। মূলত একটি ফাইলে টাইপ করা রেকর্ডগুলো সেইভ করা হয়ে থাকে। আর যেসকল যন্ত্র বা সফটওয়্যার কীলগিং করতে ব্যবহার করা হয় সেগুলোকে কীলগার বলা হয়। তুমি ফোন কিংবা পিসি ব্যবহারের সময় কত কিছুই না টাইপ করো!! ভেবে দেখো, কীলগার যদি তোমার ডিভাইসে কেউ দেয় তাহলে তোমার টাইপ করা গার্লফ্রেন্ডের মেসেজ থেকে তোমার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ফেসবুক একাউন্টসহ নানা ওয়েবসাইটের পাসওয়ার্ড পর্যন্ত সবকিছুই কিন্তু হ্যাকার পেয়ে যাবে। সাধারণত পিন কোড, অ্যাকাউন্টের নাম, ওয়েবসাইটের লিংক, পাসওয়ার্ড এগুলো টেক্সট হিসেবে .txt ফাইল ফরম্যাটে জমা থাকে। এই ফাইলটি হ্যাকার রিমোট অ্যাক্সেস, এফটিপি সার্ভার ও ইমেইলের মাধ্যমে সংগ্রহ করতে পারে। কীলগার ব্যবহার করে হ্যাকাররা প্রায় হাজার হাজর কোটি টাকা চুরি করতে সক্ষম হয়েছে, যাদের ভেতর রয়েছে ব্যাংক ও এটিএম। হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার উভয়টি দিয়েই কীলগিং করা যায়।


হার্ডওয়্যার 


কীবোর্ড হার্ডওয়্যার : এই ধরনের যন্ত্রগুলো কম্পিউটারের সাথে লাগিয়ে কীবোর্ডের ইনপুট বা স্ট্রোকগুলো লগ করা বা রেকর্ড করা যায়। এসকল যন্ত্রের কিছু ইউএসবি (USB) পোর্ট বিশিষ্ট। এসকল কীলগারের মাঝে উল্লেখযোগ্য কিছু হলো : CompSpy(কম্পস্পাই), KEYKatcher(কীক্যাচার), Keyghost(কীগোস্ট), Keygrabber(কীগ্র্যাভার)।

কীবোর্ড ওভারলে : এটিএম(ATM) ম্যাশিনগুলোতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। সাধারণত বুথের ম্যাশিনের কীবোর্ডের উপর পাতলা এক ধরনের আবরণ দেয়া হয় যা পিন কোড সংগ্রহ করে।

ওয়্যারলেস কীবোর্ড স্নিফার : এই ধরনের কীলগার ওয়্যারলেস কীবোর্ড হতে এটির রিসিভারের পাঠানো তথ্যকে লগ করতে সক্ষম যা পরবর্তীতে হ্যাকারের কাছে প্রেরণ করে। এরকম একটি কীলগার হলো KeySweeper(কীসুইপার)। 

একাউস্টিক কীলগার : তুুুুমি কীবোর্ডের প্রতিটি কী টাইপ করার সময় লক্ষ্য করে থাকবে যে প্রতিটি কী হতে ভিন্ন-ভিন্ন মাত্রার শব্দ উৎপন্ন হয়। এই শব্দকে রেকর্ড করে সেটাকে ডাটায় রূপান্তর করাই এই ধরনের কীলগারের কাজ। এসকল কীলগার সাধরণত আইন শৃঙ্খলা বাহিনী বা সিক্রেট এজেন্সিরা ব্যবহার করে। এগুলো সাধারণত কেনা যায় না বা বিক্রি করা হয়না।
 
ফার্মওয়্যার ভিত্তিক : ফার্মওয়্যার (Firmware) হলো একটা ইলেক্ট্রনিক কম্পোনেন্ট যেটা সফটওয়্যারের মতো দিকনির্দেশনা দিয়ে BIOS-কে নিয়ন্ত্রণ করে। এই ধরনের কীলগার 
কীবোর্ডের ফার্মওয়্যারের রূপ নিয়ে কী-বোর্ড এর সব ইনপুট লগ করতে পারে।

সফটওয়্যার

রিমোট অ্যাক্সেস সফটওয়্যার : এই ধরনের কীলগার সফটওয়্যার হ্যাকার দূরে থেকেই নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। ইউজার এর সকল কী-স্ট্রোক লগ করে নির্দিষ্ট সময় পর প্রাপ্ত ডেটা হ্যাকারের ই-মেইল অ্যাড্রেস বা ওয়েবসাইটে পাঠিয়ে দেয়ার জন্যে এসব সফটওয়্যার কীলগার ডিজাইন করা হয়। এদের মাঝে উল্লেখযোগ্য হলো : KidLogger(কিডলগার), Py Keylogger(পাই কীলগার), iSafeSoft Keylogger(আই সেফ সফ্ট কীলগার)। 

হাইপার(Hyper) ভিত্তিক : ভার্চুয়াল মেশিনের মত কাজ করে এসব কীলগার। এগুলো সাধারণত অপারেটিং সিস্টেমের ভেতর লুকায়িত অবস্থায় থাকে। 
যেমন : Blue Pill (ব্লু পিল)।

এপিআই(API) ভিত্তিক : API-এর পূর্ণরূপ হলো "Application Program Interface" যার মূল কাজ হলো অপারেটিং সিস্টেমের কার্যকরী অ্যাপ্লিকেশনগুলোর মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করা। উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমে GetAsyncKeyState (), GetForegroundWindow () ইত্যাদি নামের API গুলো কী-বোর্ড থেকে ইনপুট গ্রহণ করতে সাহায্য করে। এই ধরনের 
কীলগার এপিআইয়ের রূপ নিয়ে কীলগ করে থাকে।

কার্ণাল ভিত্তিক : Kernel মূলত সফটওয়্যার থেকে পাঠানো I/O (input/output) রিকুয়েস্টগুলো নিয়ন্ত্রণ করে এবং Device Drivers এর সাহায্যে OS (অপারেটিং সিস্টেম) এর সাথে হার্ডওয়্যারের সমন্বয় সৃষ্টি করে। এই কীলগারগুলো Keyboard Device Driver এর ছদ্মবেশ নেয় ও সিস্টেমকে ফাঁকি দিয়ে কী-স্ট্রোকগুলো লগ করে। 

কিভাবে কীলগার তৈরি করবে?

এখন স্বাভাবিকভাবেই তোমার জানতে ইচ্ছে হচ্ছে কিভাবে তুমি নিজেও একটি কীলগার তৈরি করতে পারো। তাই, এই ধাপে আমরা শিখবো কিভাবে সহজে কীলগার তৈরি করা যায়।

ধাপ-১ : উইন্ডোজ কী ও R কী একসাথে চাপো।

ধাপ-২ : RUN নামের প্রোগ্রাম চালু হলে বক্সের মাঝে লিখো " cmd"। তারপর "Enter" বা "OK" চাপো।

ধাপ-৩ : এখন "cmd.exe" নামক সফটওয়্যার চালু হবে।
 
ধাপ-৪ : কীলগার তৈরি করার জন্য বিভিন্ন টুলস্ রয়েছে। তবে আমরা ব্যবহার করবো "BeeLogger" (বীলগার)। এই টুলটি গিটহাব থেকে আমাদের পিসিতে ক্লোন (সহজে বললে ডাউনলোড) করতে হবে। এজন্য আমরা cmd তে নিচের কমান্ড টাইপ করবো -   


ধাপ-৫ : টুলটি তোমার পিসিতে ইনস্টল হয়ে গেলে টাইপ করো "ls" (এলএছ)। এই কমান্ডটি সকল ফোল্ডারের তালিকা দেখাবে। সেসকল ফোল্ডারের মাঝে "BeeLogger" নামক একটি ফোল্ডার দেখবে। সেই ফোল্ডারে যেতে নিচের কমান্ড টাইপ করো - 
cd BeeLogger
সেই ফোল্ডারে গেলে আবার "ls" টাইপ করে BeeLogger ফোল্ডারে থাকা ফাইলগুলো দেখতে পাবে।

 ধাপ-৬ : BeeLogger ফোল্ডারে bee.py নামের একটি ফাইল দেখবে। এটি হলো পাইথন স্ক্রিপ্ট যেটির সাহায্যে আমরা কীলগার বানাবো। কিন্তু তার পূর্বে নিচের কমান্ড রান করাতে হবে - 
./install.sh 
এটি কীলগার তৈরি করার জন্য প্রয়োজনীয় টুলগুলো তোমার পিসিতে ইনস্টল করতে থাকবে। এটি শেষ হতে কয়েক মিনিট সময় লাগতে পারে, আর কোন পার্মিশন চাইলে "Yes" করে "Next" করে দাও।

ধাপ-৭ : এখন আমরা bee.py স্ক্রিপ্টটি রান করাবো। সেটির জন্য নিচের কমান্ডটি রান করাও - 
python bee.py
ধাপ-৮ : ধাপ-৭ ফলো করে থাকলে তুমি তিনটি অপশন দেখতে পাবে। এখন তুমি কীলগার তৈরি করার জন্য 'K' টাইপ করে এন্টার দাও।

ধাপ-৯ : পরবর্তী স্ক্রিনে তুুুমি অনেকগুলো অপশন দেখতে পাবে। এগুলো বিভিন্ন রূপ নিয়ে ভিকটিমের পিসিতে কীলগ করবে। তুমি যেকোন একটি অপশন সিলেক্ট করে এন্টার দাও। 

কীলগিং যেন সঠিকভাবে কাজ করে ও তুমি যাতে তথ্যগুলো পাও সেজন্য নিচের ধাপ অনুসরণ করো।

ধাপ-১০ : কীলগিংয়ের তথ্যগুলো সংগ্রহ করতে তোমার একটি জিমেইল একাউন্ট প্রয়োজন হবে।

জিমেইলটিতে লগইন করার পর নিচের লিঙ্কে যাও - 
তারপর সেটি অন করে দাও।

ধাপ-১১ : ধাপ-৯ ফলো করে থাকলে তুমি একটি ফাইল 
পাবে, যেটিই আমাদের কীলগার। এটিকে তুমি ভিকটিমের পিসিতে পাঠিয়ে দাও। ভিকটিম যখন এই ফাইল ওপেন করবে তখনই কীলগার চালু হয়ে যাবে, আর তুমি জিমেইলে কীলগগুলো পেতে থাকবে।   

কিভাবে কীলগার শনাক্ত করবে?

কীলগার বানানো ও ব্যবহার করা এতো সহজ দেখে তোমার হয়তো ভয় হচ্ছে তোমার পিসিও কীলগার দ্বারা আক্রান্ত। কিন্তু "হোয়েন টেকনিসিয়াম ইজ হেয়ার নো ফিয়ার"। তাই এখন বলবো কিভাবে তোমার পিসির কীলগার তুমি সনাক্ত করবে। 

ধাপ-১ : উইন্ডোজ কী ও R কী একসাথে চাপো।

ধাপ-২ : RUN নামের প্রোগ্রাম চালু হলে বক্সের মাঝে লিখো " cmd"। তারপর "Enter" বা "OK" চাপো।

ধাপ-৩ : এখন "cmd.exe" নামক সফটওয়্যার চালু হবে। এখানে নিচের কমান্ড লিখে "Enter" চাপো।
netstat -b
এখন কয়েকটি লেখা বা ডাটা আসবে। সেগুলোর দিকে মন দাও। তোমার কম্পিউটার থেকে যেসব স্থানে বা সোর্সে ডাটা যাচ্ছে সেগুলো এখানে দেখাচ্ছে। এই তালিকা থেকে যদি তোমার অপরিচিত কোন এড্রেস দেখতে পাও তাহলে বুঝবে তোমার পিসি কীলগারে আক্রান্ত।

কিভাবে কীলগার রিমুভ করবে?

তোমার পিসিতে কীলগার শনাক্ত হলো, এখন উপায়? আগেই বলেছি "হোয়েন টেকনিসিয়াম ইজ হেয়ার নো ফিয়ার"। তাই তোমার অসুস্থ পিসি থেকে কিভাবে কীলগার ডিলিট করবে বা মুক্ত করবে সেটিও আমি বলছি।

ধাপ-১ : পূর্বের মতো " Windows + R" কী চেপে RUN প্রোগ্রাম চালু করো।

ধাপ-২ : RUN প্রোগ্রামের বক্সে লিখো "msconfig" ও এন্টার দাও।

ধাপ-৩ : System Configuration চালু হবে। সেখান থেকে "Startup" ট্যাবে যাও। এই তালিকায় দেখবে তোমার পিসিতে চলা কিছু প্রোগ্রাম। কিন্তু প্রোগ্রামগুলোর মাঝে যদি কোনটি তোমার অপরিচিত ও অস্বাভাবিক বলে মনে হয় তাহলে সেটি "Disable" করে দাও। 


কিছু ফ্রি সফটওয়্যার আছে যেগুলো তোমার কম্পিউটার স্ক্যান করে কীলগারগুলোকে খুজে বের করে এবং কীলগারগুলোকে ধ্বংস করে।


আমার মতে সব থেকে ভালো কীলগার রিমুভার হচ্ছে Malwarebytes ANTI-MALWARE. সফটওয়্যারটি সরাসরি ফ্রি ডাউনলোড করতে নিচের বাটন চাপো। 


ডাউনলোড করার পর সফটওয়্যারটি ইন্সটল করো। এটা খুবই ইউজার ফ্রেন্ডলি সফটওয়্যার। তুমি সহজেই এটির সাহায্যে তোমার পিসিতে কোন কীলগার আছে কিনা তা স্ক্যান করতে পারবে, আর পেলে সেটিকে ডিলিট বা রিমুভ করতে পারবে।

Post a comment

0 Comments